চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪

Alauddin Lohagara

মসজিদে আকসার প্রতি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব

প্রকাশ: ২০১৮-০১-০৫ ০৫:২০:০৭ || আপডেট: ২০১৮-০১-০৫ ০৫:২০:০৭

শায়খ ড. আব্দুল বারি সুবাইতি :

আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম হতে মসজিদে আকসা পর্যন্ত৷ যার পরিবেশ আমি বরকতময় করেছি, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাতে৷’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)৷

আল্লাহ নিজেকে এমন ক্ষমতা ও শক্তি দিয়ে মহিমান্বিত করেন, নিজের মর্যাদাকে সমুন্নত করেন, যা আর কারও পক্ষেই সম্ভব নয়৷ তাঁর কুদরত প্রকাশিত হয়েছে সেই বিস্ময়কর ভ্রমণে ও অলৌকিক মুজিজার ঘটনায় যা বিবেক-বুদ্ধিকে হতবাক ও অভিভূত করে দিয়েছে৷ কারণ তা ছিল মানুষের পরিচিত চিন্তার ঊর্ধ্বে৷ সেই ভ্রমণ হলো আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত বিশাল দূরত্বের সফর৷ সেখানে তিনি আল্লাহর বিরাট নিদর্শন ও প্রতিপালকের অসীম ক্ষমতার প্রতাপ প্রত্যক্ষ করেন৷ তারপর একই রাতে ফিরে আসেন৷

মেরাজ নবুওয়তের অন্যতম বৃহৎ নিদর্শন ও অনেক বড় মুজিজা৷ এতে নিহিত আছে প্রজ্ঞা, বিধান ও মহান তাৎপর্যমণ্ডিত বিভিন্ন শিক্ষা৷ মসজিদে হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এ ভ্রমণকে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণ করেছেন৷ বাইতুল মুকাদ্দাস নবীদের নবুওয়তের ভূমি, প্রথম কেবলা৷ এটি আমাদের নবীর জন্য সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়৷ তাঁর অবিচলতা ও সংকল্পের নবায়ন৷ এ ভ্রমণ আল্লাহর একটি জীবন্ত মুজিজা, যা মহামানবকে ঊর্ধ্বজগতে বহন করে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে৷ গোটা মহাবিশ্ব মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে৷ তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই৷ তিনি ছাড়া আমাদের কোনো পালনকর্তা নেই৷

 

মেরাজের ঘটনায় ইসলামের মহত্ত উদ্ভাসিত হয়৷ ইসলাম ধর্মে আল্লাহ পূর্ববর্তী সব শরিয়তের সমন্বয় ঘটিয়েছেন৷ ইসলাম সব শরিয়তের উপসংহার৷ মেরাজের সফর নবীদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সদৃঢ় করে দিয়েছে৷ তাঁদের সবার পয়গাম একটিই৷ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোনো আসমানে অবতরণ করেছেন তাঁকে এ কথা বলে স্বাগত জানানো হয়েছে, ‘স্বাগতম হে নিষ্ঠাবান ভ্রাতা ও মহানুভব নবী!’ নবীদের সম্বন্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘নবীগণ পরস্পর আপন ভাই, তাঁদের মা ভিন্ন ভিন্ন এবং ধর্ম এক৷ ঈসা ইবনে মারইয়ামের ব্যাপারে সব মানুষের চেয়ে আমি বেশি হকদার৷’ মসজিদে আকসায় নামাজে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে সব নবী সমবেত হয়েছিলেন৷ কেননা তিনি সব নবীর নেতা ও শ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদায় ভূষিত৷

 

আল্লাহর রাসুলকে ঊর্ধ্বাকাশে পরিভ্রমণ করানো হয়৷ তাঁর ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত আল্লাহর দাসত্ব, বন্দেগি ও ইবাদতের উচ্চ অবস্থানের জন্য তিনি এই পরম সম্মান লাভ করেন৷ ‘তিনি তাঁর বান্দাকে পরিভ্রমণ করিয়েছেন৷’ সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠতম অবস্থান প্রদান করে আল্লাহ তাঁর নবীকে নিজের বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেন৷ মেরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে গমনের এ ঘটনায় মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদে আকসার মধ্যে গভীর মজবুত সম্পর্কের পাঠ নিহিত আছে৷ এতে উম্মাহর প্রতি ইঙ্গিত আছে, যেন মসজিদে আকসার পবিত্রতা, বরকত, সম্মান ও গৌরবের পরিপ্রেক্ষিতে কোনোক্রমেই একে অবহেলা না করা হয়৷

 

আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, পৃথিবীতে কোন মসজিদটি প্রথম নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম৷ আমি বললাম, তারপরে কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা৷ আমি বললাম, দুটির মাঝে কত বছরের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, চল্লিশ বছর৷ আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি, মসজিদে আকসা—এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের জন্য সফরের আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা যাবে না৷’

 

মসজিদে আকসা তার ইতিহাস-ঐতিহ্য আর গৌরবগাথা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের অনুভূতি জ্বালিয়ে দেয়৷ শিরক ও ভ্রান্তি থেকে একে পবিত্র করতে ও তার পাশে দাঁড়াতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে জোরদার করে৷ আল-কুদসের বিষয়টি ইসলাম ধর্মের সবার মনে জীবন্ত হয়ে থাকবে৷ শত্রুদের মিথ্যাচার ও বিরোধীদের অস্বীকৃতি আমাদের এ বিশ্বাসকে টলাতে পারবে না৷

 

মেরাজের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, অসত্যের শ্লোগান, প্রচারণা ও দাবি যতই অধিক ও উচ্চকিত হোক, সত্য বিজয়ী ও প্রকাশিত হবেই৷ মিথ্যার খুঁটি নড়বড়ে, তার অস্তিত্ব দুর্বল, ধ্বংস ত্বরান্বিত, তার ভিত ধ্বংসশীল৷ আল্লাহ বলেন, ‘বরং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার ওপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়৷’ (সূরা আম্বিয়া, আয়াত : ১৮)৷ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের সময় বাইতুল্লাহর ৩৬০টি মূর্তিকে নিজের হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে বলেন, ‘সত্য এসেছে মিথ্যা অপসৃত হয়েছে৷ মিথ্যা তো অপসৃতই হয়ে থাকে৷’

মেরাজের অলৌকিক ঘটনা থেকে আমরা এমন উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি যা প্রতিফলিত হয় বান্দার প্রতি আল্লাহর সাহায্য, তত্ত্বাবধান ও তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে লাভ করে ধন্য হবার মাঝে৷ এটি তার জন্য যে আল্লাহর রজ্জু ও পথনির্দেশ আঁকড়ে ধরে৷ আল্লাহর এ সান্নিধ্য হলো বান্দাকে হেফাজত করা, সাহায্য করা, সক্ষমতা প্রদান, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য৷ এ সান্নিধ্য মুসলমানদের অঙ্গন রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ সদাজগ্রত অতন্দ্রপ্রহরী নিষ্ঠাবান লোকদের ক্ষতের নিরাময় করে৷ ওঁৎ পেতে থাকা কুচক্রী দল জানতে পারে আল্লাহর হুকুম ও বিধান উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে৷ এর ফলে সংখ্যায় অল্প হলেও মুমিনরা বিজয় লাভ করে৷ আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নির্দেশে অনেক ক্ষুদ্র দল বৃহৎ বাহিনীকে পরাজিত করেছে৷ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন৷’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ২৪৯)৷

 

উমর বিন খাত্তাব (রা.) সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস (রা.)কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা শত্রুর বিপক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জামের শক্তি দিয়ে বিজয় লাভ করতে পারবে না৷ তোমরা বিজয়ী হতে পারবে তোমাদের রবের আনুগত্যের মাধ্যমে আর শত্রুদের পাপের ফলে৷ যদি পাপের ক্ষেত্রে তোমরা সমান সমান হও তবে অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জামের শক্তি বলে তার তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করবে৷’

 

আল-কুদস ও মসজিদে আকসা যেহেতু মুসলমানের হৃদয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, তাই তাদের কর্তব্য হলো, সব ধরনের অবমাননা থেকে আল্লাহ যেন একে রক্ষা করেন সেজন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে মিনতি করা, ফিলিস্তিনবাসীদের জন্য বিজয় ও অবিচলতার প্রার্থনা করা৷ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কোনো প্রার্থনা করলে তিনি তাকে তা দিয়ে দেন কিংবা তার তদ্রূপ কোনো বিপদ দূর করে দেন, যদি সে অন্যায় ও আত্মীয়তা ছিন্ন করার প্রার্থনা না করে থাকে৷ তখন এক লোক বলল, আমরা যদি বেশি বেশি দোয়া করি? তিনি বললেন, আল্লাহ আরও বেশি দেবেন৷’

 

১১ রবিউস সানি১৪৩৯ হিজরি মসজিদে নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত

 

ভাষান্তর করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *