চট্টগ্রাম, , শুক্রবার, ১২ আগস্ট ২০২২

Alauddin Lohagara

‘নিষ্ঠুর গলি’

প্রকাশ: ২০১৮-০২-১২ ২১:০২:০১ || আপডেট: ২০১৮-০২-১২ ২১:০২:০১

অধ্যাপক আকতার চৌধুরী:

১৯৮৬ সালের কোন এক বিকেলে কক্সবাজার শহরের তারাবনিয়ার ছড়া মসজিদের পাশে সাপ্তাহিক স্বদেশবাণীর (বর্তমান দৈনিক কক্সবাজার) অফিসে বসে আছি। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে প্রবেশ করলেন সাগর বেলাল মামা। পুরো নাম বেলাল উল ইসলাম সাগর। পত্রিকার সাহিত্য বিভাগটা সেই দু:সময়ে তিনিই দেখাশোনা করতেন। বেশ মজা করে কবিতাও লিখতেন। যদিওবা ওনার অনেক কবিতা আমি বুঝতাম না। চালচলনে কাঁধে একটা ঝুলন্ত ব্যাগ আর পান্জাবীতে কবি কবি ভাবটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করতেন। রিপোর্টিংও করতেন। তা ছাড়া সম্পাদকের আত্মীয় হিসেবে কিছুটা ভাবও ছিল । তবে আমি জুনিয়র হলেও আত্মীয়তার সুত্রে মামা ভাগ্নে হওয়ায় ঠাট্টা মসকারিও কম হত না ।

মামার ঝুলি থেকে সব সময় কবিতা বের হত । আমাকে দেখাত । পত্রিকায় ছাপাত ।  আজ কেন জানি গদ্য আকারের লেখা দেখা যাচ্ছে । একটু আগ বাড়িয়ে দেখতে গিয়ে হেড লাইনটা চেখে পড়ল – ‘নিষ্ঠুর গলি ’!

আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল।

একটু মুচকি হাসিতে বেলাল মামার জিজ্ঞাসা – তুমি কি জান কক্সবাজার শহরে ‘নিষ্ঠুর গলি’ নামে একটা গলি আছে ?

আমার স্বাভাবিক উত্তর – না তো মামা!

এত বছর কক্সবাজার শহরে বসবাস । প্রত্যেক গলির নাম আমার মুখস্ত । অথচ এ নামে একটা গলি আছে আমার জানা ছিল না । তার উপর গলির নামের সাথে নিষ্ঠুরতার কি সম্পর্ক!

তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান সকলের প্রিয় আবচার ভাই অনেক রাস্তা অলিগলির নামকরণ ও শুরু করেছিলেন । যেমন- রাজনৈতিক দলগুলোর কমন জনসভাস্থল লালদীঘির পশ্চিম পাড়কে ‘বঙ্গবন্ধু সড়ক’ , সার্কিট হাউস রোডকে ‘শহীদ সরণী’ , সায়মন রোডকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সরণী’ , হলিডে মোড় থেকে লাবণী সড়ক কে ‘বিজয় সরণী’ নামকরণ করেন। কিন্তু নিষ্ঠুর গলি নামকরণ তো কোথাও করেছে বলে শুনিনি। সেদিনের ‘নিষ্ঠুর গলি ’ নামকরণটা আজো আমার মনে গেঁথে আছে।

কক্সবাজার শহরে তখন আমরা কলেজ পড়ুয়া জুনিয়র গ্রুপ । কিন্তু রোমিও সেজে অলিতে গলিতে দাড়িয়ে থাকার সুযোগ তেমন আমাদের হয়নি । কারণ সিনিয়র রোমিও ভাইদের দাপটে আমাদের কোনঠাসা অবস্থা। তখন শহরে কংফু কারাতে শেখার একটা আলাদা প্রবণতা ছিল। পুরো শহরের রোমিওরা কোন না কোন কারাতে গ্রুপের সদস্য থাকত। তাদের এলাকাও ভাগ ছিল । এক এলাকার রোমিও আরেক এলাকায় প্রবেশ নিষেধ। পেলে উত্তম মধ্যম দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হত। এদের মধ্যে ‘কারাতে মনজুর’ গ্রুপ (প্রয়াত এড. আবুল মনজুর ভাই), কারাতে আবু গ্রুপ (বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার কর্মকর্তা) , কারাতে সিরাজ গ্রুপ ( বর্তমানে কক্সবাজার পৌরসভার কাউন্সিলর) অন্যতম ছিল।(যাদের নাম বললাম সবাই আমার শ্রদ্ধেয় বড় ভাই)। এছাড়াও আরও অনেক গুলো কারাতে গ্রুপ কক্সবাজারের অলিগলিগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। যাদের অনেকের নাম এ মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে না।

ওই নিস্টুর গলিতে অনেকগুলো বড় আপু ছিল। দেখতে সুন্দরী । দেমাগ ও কম না । গলিতে তাদের চলাফেরাও ডেমকেয়ার টাইপের । আর সিনিয়র গ্রুপের রোমিও বড়ভাইরা দাড়িয়ে থাকত গলিতে । কখনো ‘আই লাভ ইউ’ লেখা কাগজের টুকরো ছুড়ে মারত । কখনো অতিকষ্ঠে যোগাড় করা লাল গোলাপটা নিজের মুখের কাছে এনে গন্ধ সুখত। দেয়ার সাহস হতনা । আপুরাও কম পাষাণী ছিল না। ছুড়ে দেয়া কাগজটা তুলে নিয়ে একটু পড়ে দেখার আগ্রহও দেখাত না । এদিকে রোমিও বড়ভাইদের বুকটা ফেটে যেত। অপমান বোধও হত। এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে দেখে ঠাট্ঠা করত – তোকে ত পাত্তাই দিল না ! বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্রও হত।

 

নিষ্ঠুর গলির এমন প্রত্যাখ্যান সহ্য করতে না পেরে সকল রোমিওর যৌথ উদ্যোগে এক আপুকে জোর করে ধরে নিয়ে বিয়েও করেছিল । অবশ্য তাদের এখন সুখের সংসার চারিদিকে শোভিত হচ্ছে। এই একটা ঘটনা ছাড়া নিস্টুর গলির বাকি আপুদের বিয়ে কক্সবাজার শহরের কারো সাথে হয়নি। সবাই এখন বিভিন্ন শহরে প্রতিষ্ঠিত স্বামীদের সংসারে। মনে হয় তাদের একটা সংকল্প ছিল – ঘরের গরু ঘাটার ঘাস খাবে না।

শেষে মনের দু:খে গলির রোমিওদের একজন রাতের বেলা চিকা মারার ব্রাশ নিয়ে গলির দেয়ালে লিখে দেয় ‘নিষ্ঠুর গলি’।

সে লেখাটা আমরা আসা যাওয়ার সময় দেখতাম। হাসতাম। এই গলির আপুদের নিষ্ঠুরতার কথা স্মরণ করে নারীদের হাত থেকে ১০০ হাত দুরত্ব বজায় রাখার মনস্থ করতাম।

প্রায় একই সময়ে কক্সবাজার শহরে আরো একটা গলির নামকরণ করা হয়েছিল । এ গলির কাহিনীটা একটু করুণ। ভালবেসেছিল এ গলির এক আপুকে আরেক গলির রোমিও বড়ভাই।তবে ভালবাসার গভীরতায় বিয়ের আগে অঘটনটা ঘটে যায় । অবস্থা কাহিল । আপুর পেটে সন্তান । এদিকে রোমিও বড়ভাই বিয়ে করতে অস্বীকার করে বসে । এনিয়ে পাড়ায় অনেক শালিস নালিশ বৈঠক । কোন সুরাহা নেই। এই ফাঁকে কেউ একজন গলিতে চিকা মেরে লিখে দেয় ‘কলংকিত গলি’ । শহরে রটে যায় । এ নিয়ে বিব্রত হয় গলির বসবাসকারী সবকটা পরিবার। পরে অবশ্য সমাজের চাপে রোমিও বড়ভাই জুলিয়েট আপুকে বাচ্চাসহ ঘরে তুলে নিয়ে ‘কলংকিত গলি’র কলংক দুর করেছিলেন।

 

জানিনা আজকের ভালবাসা দিবসের সাথে তখনকার ‘নিষ্ঠুর গলি ’ ও ‘কলংকিত গলি’র কোন সম্পর্ক ছিল কিনা। তবে ভালবাসার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় এই গলিগুলোর নামকরণ। ভালবাসা চিরন্তন। স্বাশ্বত । কোন বিশেষ দিবসকে ঘিরে নয় । ভালবাসায় প্রতিদিন ১৪ ফেব্রুয়ারী। প্রতিদিন ভ্যালেন্টাইন ডে ।

(অধ্যাপক আকতার চৌধুরী ,সম্পাদক ,কক্সবাজারনিউজ ডটকম)

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *