চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৮ জুন ২০২২

admin

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ দরকার; জনসচেতনার বিকল্প নেই

প্রকাশ: ২০১৮-০৮-০৫ ০১:৩০:৪৭ || আপডেট: ২০১৮-০৮-০৫ ০১:৩০:৪৭

 

বেলাল উদ্দিন চৌধুরী,:

পত্রিকার পাতা খুললে কিংবা টিভি চ্যানেলের  সংবাদের দিকে চোখ রাখলেই প্রতিদিন চোখে পড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত হওয়ার সংবাদ। দেশে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, যা দেখে মনেহয় আমাদের সড়ক-মহাসড়কের সর্বত্রই  বিশৃঙ্খলার মহোৎসব চলছে। এতে প্রাণ যাচ্ছে একের পর এক। তবে এভাবেই কি দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে মানুষের মৃত্যুর বিভীষিকা চলতে থাকবে? আমাদের দেশের গাড়িচালকের সঠিক প্রশিক্ষণ না থাকা, অপ্রাপ্তবয়স্ক গাড়িচালক, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, সড়কের নাজুক অবস্থা, মাদকাসক্ত গাড়িচালক, ওভারটেক করাসহ বিভিন্ন কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার দিন দিন বেড়েই চলছে। আর এই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমাদের দেশে প্রতিবছর অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে।

 

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো ১২ জন। ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় দুই বাসচালকের রেষারেষিতে ডান হাত বিছিন্ন হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেন’র মৃত্যু হয়। ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেট এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যান ওভারটেক করতে গিয়ে রিয়া বড়ুয়া নামের এক কলেজ ছাত্রীর মাথার ওপর দিয়ে চালিয়ে দেয়। মুহুর্তের মধ্যেই রিয়া বড়ুয়া প্রাণ হারান। বাবার সংসারের হাল ধরতে ধোবাউড়া থেকে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে ঢাকায় আসা রোজিনা কিছুদিন আগে রাতে বনানীর চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় উত্তরাগামী বিআরটিসি দোতলা বাসের চাপায় ডান হাত হারিয়ে ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। গত ২২ জুলাই বিকেলে কর্মস্থল যাবার পথে রাজশাহীর গোদাগাড়ি নামক স্থানে ট্রাক ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে আইসিটি প্রতিমন্ত্রীর ভাতিজিসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এমন দূর্ঘটনা জনিত মৃত্যুর খবর আমরা প্রতিনিয়ত পাই। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী গত ছয় মাসে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৩ হাজার ২৬ জন এবং আহত হয়েছেব ৮৫২০ জন।বিশেষজ্ঞরা দাবি করছেন, প্রতিদিন দেশে এভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে ৬৪ জন। অার এসব সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা।

 

পৃথিবীর কোনো দেশে এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে না এবং যানবাহন সংক্রান্ত হতাহতের রেজিস্টারও এত বড় হয় না। ঘর থেকে বের হয়ে কেউ যে নিরাপদে বাসায় ফিরে আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। জীবন হাতে নিয়ে ঘর থেকে বের হতে হয়, ভয় লাগে বাহনরূপী দানবগুলো হয়তো এখনই পিষে মেরে ফেলবে। এভাবে চলতে থাকলে থাকলে আমরা সকলেই একটি অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চলাচল করবো প্রতিদিন। সড়কে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা জরুরি। তার জন্য সরকার, জনগণ ও ট্রাফিক বিভাগের তৎপরতা বৃদ্ধি করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দক্ষ চালক তৈরি, যুগোপযোগী রাস্তা, ফুটপাত ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ, ট্রাফিক ব্যাবস্থার আধুনিকীকরণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে না পারলে আকাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। এজন্য যা কিছু কাজ করা দরকার, তা হল-

আমাদের সড়কে ১৪ বছর বয়সের গাড়ির হেল্পাররাও গাড়ি চালায়। আবার অনেকেই প্রথম দিন একটু ট্রেনিং নিয়েই পরেরদিন থেকে গাড়ি চালাতে শুরু করে। এসব কারনে সড়ক দূর্ঘটনার পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

টাকা দিলেই মিলে ড্রাইভিং লাইসেন্স। যেখানে কোনো পরীক্ষায় পাশ করা লাগেনা। তাই যথাযথ ড্রাইভিং পরীক্ষা ব্যতীত ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার সব পথ বন্ধ করতে হবে। একই সাথে নকল লাইসেন্স প্রদানের অবৈধ পথগুলো জরুরি ভিত্তিতে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ভুয়া লাইসেন্স পরীক্ষার যন্ত্র বসিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে যাত্রীদের সচেতনা খুবই জরুরী। অতিরিক্ত যাত্রী বুঝাই যানবাহন এড়িয়ে চলতে হবে, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালককে না বলতে হবে। কয়েক মিনিট আগে যাওয়ার জন্য লাইফ রিস্ক নেওয়াটা বন্ধ করতে হবে এখনই।

সিটিতে বাস, মিনিবাস ও টেম্পোতে যাত্রী ওঠানামা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রী ওঠানামা করানোর নির্দিষ্ট পয়েন্ট থাকা সত্ত্বেও রাস্তার ওপর ডান-বাম দিয়ে অন্য যানবাহন চলা অবস্থায় একটু গতি কমিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয় সিটিতে। যারফলে অনেক যাত্রী রাস্তায় পড়ে আহত হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। নির্দিষ্ট পয়েন্ট ছাড়া কোথাও যেন যানবাহন থামতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং এর জন্য আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের দেশে মাতাল হয়ে চালকের আসনে বসায় গাড়ির নিয়ন্ত্রন হারানোর রেকর্ড অনেক। তাই মাতাল হয়ে কোন চালক যেন গাড়ি চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারন বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং। গাড়িচালকরা একটু ফাঁকা রাস্তা পেলে পাগলা ঘোড়ার মতো গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়, তাই শহরের ভেতরে ও বাইরে সড়ক এবং মহাসড়কে স্পর্শকাতর জায়গায় গাড়ির গতিসীমা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে এবং সেটা পালনে বাধ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে ওভারটেকিং নিষেধ থাকা এলাকায় ওভারটেক করলে শাস্তির কার্যকরী ব্যাবস্থা নিতে হবে।

মুখোমুখি সংঘর্ষের একমাত্র কারন রাস্তায় ডিভাইডার না থাকা। প্রত্যেক রাস্তায় ডিভাইডারের ব্যবস্থা করতে হবে।

পথচারী হাঁটার জন্য ফুটপাত নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের অনেক রাস্তায়ই ফুটপাত নেই এবং যেখানে যতটুকু আছে, সেটাও আবার ক্ষমতাধর ও হকার্সদের দখলে, মানুষ হাঁটবে কোথায়? দুর্ঘটনা কমবে কিভাবে?

ফিটনেস বিহীন ও দুমড়ানো-মোচড়ানো গাড়ির চলাচল বন্ধ করতে হবে। কারণ ওই ধরনের গাড়িগুলো দুর্ঘটনা বেশি ঘটিয়ে থাকে।

দেশের কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে সবসময় দূর্ঘটনা ঘটে। তাই, দুর্ঘটনাপ্রবণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে দেশি-বিদেশি সর্বোচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত কমিটির পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে হবে।ট্রাফিক পুলিশের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এবং একই সাথে অনৈতিক ট্রাফিক পুলিশদের নৈতিকতাবোধ জাগ্রত করতে হবে। কোনো ধরনের অবৈধগাড়ি, লাইসেন্স বিহীন চালক, ফিটনেস বিহীন গাড়ি যেন রাস্তায় চলতে না পারে সেই বিষয়ে ট্রাফিকদের কঠোরভাবে দায়িত্বপালন করতে হবে।

বিশেষ ছুটির সময় গুলোতে সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পায়। যেনম ঈদের ছুটি, কোরবানীর ছুটি এবং দুর্গাপূজার ছুটিতে মানুষ যখন গ্রামমুখি হয় তখন দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। তাই বিশেষ ছুটির সময় গুলোতে কর্তৃপক্ষকে সড়কে বিশেষ ব্যাবস্থা নিতে হবে।

সড়ক দুর্ঘটনা কোনো অপ্রতিরোধ্য বিষয় নয়। তাই সরকারি ও বেসরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে চালক, ট্রাক ও ট্রাফিক পুলিশ সবাইকে সাথে নিয়ে তা রুখতে হবে। সবচেয়ে বড় দরকার কার্যকরী পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা। মনে রাখতে হবে আমাদের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারনে যেন আর একটি সড়ক দুর্ঘটনাও না ঘটে।

 

-বেলাল উদ্দিন চৌধুরী,

আইন বিভাগ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *