চট্টগ্রাম, , শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯

পশুর হাটে নজর গয়ালের দিকে !

প্রকাশ: ২০১৯-০৮-১০ ২৩:৪৯:০২ || আপডেট: ২০১৯-০৮-১০ ২৩:৪৯:০২

আব্বাস হোসাইন আফতাব, রাঙ্গুনিয়া : গরুর মতো দেখতে হলেও কিন্তু গয়ালের শিং দুই পাশে ছড়ানো, সামান্য ভেতরমুখী বাঁকানো। শিঙের গোড়া অত্যন্ত মোটা। কালো গয়ালের হাঁটুর নিচ থেকে ক্ষুর পর্যন্ত সাদা লোমে ঢাকা। মনে হয় সাদা মোজা পরানো। মাথার ওপরের কিছু অংশ এবং কপালেও রয়েছে সাদা লোম। গয়ালের কুঁজ এত বড় যে তার অবস্থান কাঁধ থেকে পিঠের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিস্তৃত। নাদুস নুদুস এই পশুর দাম হাঁকা হয়েছে ৪ লাখ টাকা। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ এলেই রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার গোডাউন পশুর হাটে ওঠে গয়াল। কোরবানির পশু হিসেবে কেউ কেউ গয়াল কিনেন। তবে সংখ্যায় তা হাতেগোনা। হাটের গয়াল বিক্রেতা জানান, “গয়াল তো এখন নেই বললে। বানিজ্যিকভাবে গয়াল খামার করতে কেউ সাহস করেনা। রাঙ্গুনিয়ার শুধুমাত্র একটি খামার থেকে গয়াল বিভিন্ন স্থানে যায়। ” আজ শনিবার (১০ আগষ্ট) সকালে গোডাউন হাটে গিয়ে দেখা যায় ৫ টি গয়াল উঠেছে। গয়ালগুলো কখনো বসে, কখনোবা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। একেকটি একটু দূরেই বাঁধা আছে ৫ টি গয়াল। একেকটির দাম হাঁকা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। গোডাউন পশুর হাটের গয়ালের মালিক হচ্ছেন এরশাদ মাহমুদ। তিনি নিজেই খামারে গয়াল দেখাশোনা করেন। তিনি বলেন, কোরবানি উপলক্ষে গয়াল তিনি বিভিন্ন হাটে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছেন। খামার থেকেও বিক্রি হয়েছে গয়াল। একেকটির দাম হাঁকা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। পশুর হাট ও খামার মিলে গত তিনদিনে ৯ টি গয়াল ১৮ লাখ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে বলে তিনি জানান।

গয়াল নিয়ে আগ্রহ দেখা গেছে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যে। সকালেও গয়াল প্রাণীর আশপাশে ছিল মানুষের জটলা। কেনার ছেয়ে দেখতে এসেছেন অনেকেই। কেউ কেউ গয়ালের সাথে মুঠোফোনে সেলফি তুলছেন। এসময় গয়ালের দাম জিজ্ঞেস করতে দেখা গেছে কয়েকজন লোককে। হাটে পশু কিনতে এসেছেন ব্যবসায়ী মাহাবুবুল আলম (৪০) । তিনি বললেন,“ আগে জানতাম গয়াল গহীন বনে থাকে। সচরাচর দেখাও যায় না। ছবিতে দেখেছি গয়াল। আমি জীবনে এই প্রথম গয়াল দেখলাম। দরদামে হলে একটা কিনে নেব।” গোডাউন হাটের ইজারাদার মো. সালাউদ্দিন বলেন, প্রতিবছরই এই হাটে গয়াল তোলা হয়। অনেকেই কেনার চেয়ে হাটে গয়াল দেখতে আসেন। এবারও গয়াল এসেছে।

” উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডাক্তার হারুন অর রশিদ বলেন, “ দেশের একমাত্র বানিজ্যিক গয়াল খামার রাঙ্গুনিয়ায় রয়েছে। মাংসের চাহিদা পূরণে গয়ালের খামার গড়ে তোলা একটি ভালো লক্ষণ।’ উপজেলা প্রাণি সম্পদ দপ্তর পশুর হাটে গয়ালের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিরিক্ষায় বিশেষ নজর রাখছে। ‘গহিন বনের যেখানে ছোট ছোট ঝোপের কচিপাতা ও ডালপালা আছে তেমন জায়গা গয়ালের বেশ পছন্দ। সাধারণত, ১০-১১ মাস গর্ভধারণের পর মাদি গয়াল একটি বাচ্চার জন্ম দেয়। গাভির মতো এদের ওলান নেই স্তনবৃন্ত ছোট হওয়ায় এদের থেকে কখনো দুধ দোহানো যায় না। ’গয়ালের ব্যবহার জনপ্রিয় হলে দেশি-বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরত যেমন কমে আসবে, তেমনি গয়ালের বাণিজ্যিক লালন পালনে মানুষ আকৃষ্ট হবে। গয়ালের মাংসে কোলেস্টেরল কম হওয়ায় এটি মানবদেহের জন্য সবসময় কম ঝুঁকিপূর্ণ।

গয়াল শুধু দুর্বল খাবারেই লালন পালন করা হয়ে থাকে এবং এদের দেহে কোনো ধরনের কৃত্রিম ওষুধ প্রয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে না। গয়ালের মাংস সবার জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত বলেও জানান এই কর্মকর্তা জানান। গয়াল খামারি এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘একসময় গয়াল বন্যপ্রাণী হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন এটি ফাঁদ পেতে বন থেকে ধরে এনে চোরাই পথে বেচা বিক্রি হতো। পরে বনবিভাগ গয়ালের ওপর থেকে বন্য প্রাণীর পরিচিতি তুলে নিয়ে এটিকে গৃহপালিত গবাদিপশু হিসেবে ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে পশুটির বাণিজ্যিক পালন শুরু হয়।

বাণিজ্যিক উৎপাদনের পর থেকে ধীরে ধীরে গয়ালের চাহিদাও বেড়ে চলে। জেয়াফত, মেজবানি, ওরশসহ সামাজিক অনুষ্ঠানে গয়ালের চাহিদা আছে। কুরবানীর পশুর হাটেও বিক্রি হচ্ছে গয়াল । তার খামারটি দেশের একমাত্র বড় গয়াল খামার বলে তিনি দাবি করেন। ’ তিনি আরো বলেন, ২০০৮ সালে পার্শ্ববর্তী রাঙামাটি জেলার গহিন বনের এক উপজাতীয় পরিবার থেকে তিনি তিনটি গয়াল কিনে এনেছেন। এর মধ্যে একটি বাচ্চা ও একটি মাদি গয়াল ছিল। এখন তাঁর খামারে রয়েছে ৬৯ টি গয়াল। ৩৪টি বড় গয়াল। পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস শাকিলা পাহাড় এলাকায় গড়ে তোলা গয়ালের খামারের পাশে গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়েছে। বায়োগ্যাসের উচ্ছিষ্ট গোবর মাছের খাবার হিসেবে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৎস্য প্রজেক্টে দেওয়া হচ্ছে। গয়াল ও বায়োগ্যাস প্ল্যান্টের জন্য খামারে রয়েছে ৭ জন কর্মচারী।

গয়াল খামারের তত্ত্বাবধায়ক টিটু কুমার বড়–য়া ও মো. ইয়াছিন বলেন, “কুরবানী পশুর হাটে গয়ালের চাহিদা রয়েছে। গত বছর কুরবানী হাটে ৭ টি বড় গয়াল বিক্রি করা হয়েছে। এবছরও কুরবানী হাটে গয়াল বিক্রি করা হচ্ছে। একেকটি বড় গয়ালের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। এ কয়েক বছরে বিক্রি করা হয়েছে ৪৩ টি গয়াল। দেশের বিভিন্ন গরুর গড় ওজন ২০০ থেকে ৪০০ কেজি। কিন্তু প্রতিটি গয়ালের গড় ওজন ৬০০ থেকে ৭০০ কেজি হয়। এখন বৃষ্টির সময় পশুর পায়ে ক্ষুরারোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তাই একটু বেশি সতর্ক থাকতে হচ্ছে। ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *