চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০

কাইছার হামিদ

লোহাগাড়ায় জনবসতি ও কৃষি জমিতে গড়ে ওঠেছে অর্ধশতাধিক ইটভাটা!

প্রকাশ: ২০১৯-১২-০৬ ১১:৫৭:৩২ || আপডেট: ২০১৯-১২-০৬ ১১:৫৭:৪১

কাইছার হামিদ: লোহাগাড়া উপজেলার ইটভাটাগুলো জনবসতি এলাকা ও কৃষি জমির উপরে বছরের পর বছর ধরে অবাধে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এমন কি ভাটার পার্শ্ববর্তী কৃষি ও বনভূমিতেও ব্যাপ্তি ছড়িয়ে আছে ইটভাটাগুলো। ফলে নয়টি ইউনিয়নে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। জনবসতিপূর্ণ এলাকা হয়ে পড়েছে হুমকির মূখে। অন্যদিকে ইটভাটায় ইট পোড়াতে কাঠের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও জ্বালানি হিসেবে অবাধে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

জানা গেছে, উপজেলায় রয়েছে অর্ধশতাধিক ইটভাটা। চরম্বা ইউনিয়নে ২১টি, লোহাগাড়া সদরে ২ টি, পুটিবিলা ইউনিয়নে ৪ টি, কলাউজান ইউনিয়নে ৬ টি, পদুয়া ইউনিয়নে ৩ টি, বড়হাতিয়া ইউনিয়নে ৪টি, চুনতি ইউনিয়নে ১টি, আধুনগর ইউনিয়নে ১ টি ও আমিরাবাদ ইউনিয়নে ৫ টি ইটভাটা অবৈধভাবে গড়ে ওঠেছে।

ইটভাটা করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ও কৃষি বিভাগের অনুমতিপত্র লাগে। এসব ইটভাটার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলায় কৃষি জমিতে, লোকালয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে, রাস্তার পাশে ও পাহাড়-বনাঞ্চলের পাশে এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। ইটভাটার চিমনি দিয়ে গরম ছাইয়ের কণা নিকটবর্তী কৃষি জমিতে পড়ার কারণে জমির ফসল ও মাটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া ভাটায় ট্রাকের বেপরোয়া যাতায়াত, ইটের কণা চারপাশে ছড়িয়ে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে বহু কৃষি জমি চাষাবাদ হয়নি। ইটভাটার কারণে উপজেলার অসংখ্য কৃষি জমিতে ফলনও কমে যাচ্ছে।

জানা যায়, গত ১০ বছরে প্রায় আড়াই হাজার একর জমি ইটভাটাসহ বিভিন্নভাবে অকৃষি শ্রেণিতে চলে যাচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ০.০৯ হেক্টর জমি চলে যাচ্ছে অকৃষিতে। বর্তমানে উপজেলার শত শত একর কৃষি জমি ইটভাটার দখলে। আর ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে ধানের ফলন হ্রাস পাচ্ছে। এতে প্রতিবছর বোরো ও আমন মৌসুমে চাল উৎপাদন কমছে। যেসব কৃষি জমি থেকে ভাটার টপসয়েল যোগাড় করা হচ্ছে সেসব জমির উৎপাদনও কমছে।

বনাঞ্চলের পাশে, লোকালয়ে ও কৃষি জমিতে এসব ইটভাটা অবস্থিত। তবে প্রায়ই ইটভাটা কৃষি জমির ওপর এবং প্রতিটি ইটভাটায় কৃষি জমি লেগেছে প্রায় ৭ একর। ইটভাটায় ব্যবহার হচ্ছে কৃষি জমির ওপরের উর্বর মাটি। ইটভাটায় পাহাড় ও টিলা কাটা নিষেধ থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। ফলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা করার কোনো নিয়ম নেই। কৃষি জমির টপসয়েল নিয়ে গেলে প্রথম দুই বছর প্রায় ৭০ ভাগ ফসল কমে যায়। কৃষি জমির টপসয়েল চলে গেলে আগামী ৮/১০ বছরে জমির স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসা কঠিন। উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় কৃষি জমিতে ইটভাটা তৈরি না করার জন্য জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়। নতুন এলাকার কৃষকদেরকেও কৃষি জমির টপসয়েল বিক্রি করতে নিষেধ করা হয়েছে। কৃষি জমির টপসয়েল ইটভাটায় যেন ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য কৃষকদের সচেতন করা উচিত বলে মনে করেন সচেতন মহল।

অবৈধ ও অনুমোদনহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এমন কথা প্রশাসনের লোকজন প্রতিবছরই বলে থাকেন। কাজের কাজ কিছুই হয় না। ইটভাটা মালিকরা প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ইট পুড়িয়ে যাচ্ছে দেদারছে। প্রতি বছর সরকার বাহাদুর ইটের পরিবর্তে ব্লক তৈরির কথা বললেও কাজ হচ্ছে না। বরং ইটভাটা বেড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ ও বন বিভাগের লোকজনদের ম্যানেজ করে অবৈধ ইটভাটা গড়ে ওঠে বলে জানান স্থানীয় লোকজন।

ইটভাটায় কৃষি জমির টপসয়েল ব্যবহার ও পাহাড়ের মাটি কাটার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে সবসময় জিরো টলারেন্সে থাকা উচিত। না হয় আগামী প্রজন্মের জন্য এ উপজেলা হবে মারাত্মক হুমকি। লোহাগাড়ায় ইটভাটাগুলো অধিকাংশ ইটভাটা কৃষি জমির ওপর। উপজেলায় যেহারে কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে তাতে ভবিষ্যতে পরিবেশ ও খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ইটভাটা পরিবেশবান্ধব করা না গেলে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *