চট্টগ্রাম, , রোববার, ১২ জুলাই ২০২০

কাইছার হামিদ

২০১৯ সালে কোন ইস্যুই কাজে লাগাতে পারেনি বিরোধীদল

প্রকাশ: ২০২০-০১-০১ ১০:৫১:১৭ || আপডেট: ২০২০-০১-০১ ১২:০০:২৯

কাইছার হামিদ: ২০১৯ সালে আন্দোলনের অনেক ইস্যু ছিল। কাজে লাগাতে পারেনি বিরোধীদল। এমনকি বিএনপি তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবিতে জোরদার আন্দোলনও গড়ে তুলতে পারেনি। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ দল ও জোটের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের শরিকরা রাজপথে ছিল অনেকটা নিষ্ক্রিয়।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা, মতবিরোধসহ বিভিন্ন কারণে সারা বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। বছরজুড়ে একের পর এক ইস্যু এসেছে; কিন্তু এসব ইস্যু কাজে লাগাতে পারেনি। পক্ষে টানার জন্যও তারা জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি।

প্রেস ব্রিফিং, সভা-সমাবেশ আর টকশোয় সরব ছিলেন বিরোধীরা। রাজপথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় ক্ষোভ এবং হতাশা। ভাঙনের মুখে পড়ে নির্বাচনের আগে গড়ে ওঠা সরকারবিরোধী জোট। প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন জাতীয় ঐক্যজোটের নেতারা।

পেঁয়াজের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাসের দাম বাড়ানো, ডেঙ্গুসহ একের পর এক ইস্যুতে বছরজুড়ে প্রায়ই দিশেহারা ছিল সাধারণ মানুষ। একটা শেষ হতে না-হতেই এসেছে আরেকটি। এরপরও তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে মাঠ গরম করতে পারেনি। মাঝে কিছু বিষয়ে পদক্ষেপ নিলেও সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপে তা সম্ভব হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের রাজপথে দাঁড়াতে দেয়নি। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে বিরোধীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সোমবার নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির এ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সকাল থেকেই সেখানে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধায় শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয় তাদের সমাবেশ। একই ইস্যুতে বাম গণতান্ত্রিক জোট প্রেস ক্লাবে সমাবেশ শেষে কালো পতাকা মিছিল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দিকে রওনা হয়। প্রথমে কদম ফোয়ারা এবং পরে মৎস্য ভবনের সামনে বাধা দেয় পুলিশ। এক পর্যায়ে উপস্থিত নেতাকর্মীদের লাঠিচার্জ করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিলে বিরোধী দলগুলো জনস্বার্থে সরব হয়। মাঠে আন্দোলন শুরু করে। অতীতে এমন অনেক ইস্যুতে বর্তমান সরকারি দলও আন্দোলন করেছে। কিন্তু গত এক বছরে সরকারবিরোধী দল, জোট এমন অনেক ইস্যু পেয়েছে। কিন্তু আন্দোলন দাঁড় করাতে পারেনি। মাঝে মাঝে চেষ্টা করলেও তারা জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তবে মামলা, গ্রেফতারের ভয়েও অনেক নেতাকর্মী রাজপথে নামেননি। শুধু কোনো একটি দল নয়, সার্বিকভাবে সরকারবিরোধী সব দল বা জোট এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।

জানা গেছে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে রাজপথে নামতে বিএনপির তৃণমূলের ব্যাপক চাপ ছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নিজেদের ঐক্য না থাকাসহ একাধিক কারণে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি দলটি। রাজপথে দাঁড়াতে না পারায় তৃণমূলে বিরাজ করছে হতাশা ও ক্ষোভ।
দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা জানান, জনগণের পাশে দাঁড়ানোর মতো সাংগঠনিক শক্তি বিএনপি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে। নানা কারণে দলের ভেতরে বিরাজ করছে অস্থিরতা। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধাক্কা সামলিয়ে এখনও দলকে পুরোপুরি গোছাতে পারেনি।

এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে দেখা দেয় মতবিরোধ। প্রায় বছরজুড়েই নিষ্ক্রিয় ছিল ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। নিজেদের মধ্যে ঐক্যই ধরে রাখতে পারেনি ফ্রন্ট।

মতবিরোধের কারণে ফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে যায় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। শুধু ফ্রন্ট নয় ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যেও ছিল অস্থিরতা। জোট থেকে বেরিয়ে যায় আন্দালিব রহমান পার্থ। কয়েকটি শরিক দলের ভেতরেও সৃষ্টি হয় ভাঙন।
নানা ইস্যুতে ২০ দলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ জোটের কয়েক শরিক নিয়ে আলাদা একটি ফ্রন্ট দাঁড় করান। এ নিয়েও বিএনপির সঙ্গে সৃষ্টি হয় দূরত্ব। দল, জোট ও ফ্রন্টের মধ্যে অস্থিরতার কারণে রাজপথে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয় তারা।

বছরজুড়ে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট একাধিক ইস্যু থাকলেও বিরোধী দলগুলো রাজপথে দাঁড়ায়নি। এ নিয়ে তারা কোনো মাথা ঘামায়নি। তাদের কার্যক্রম শুধু বক্তব্য আর বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দল হিসেবে একটা প্রহসনে পরিণত হয়েছে বিরোধীরা।
জনস্বার্থের বদলে বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে, বিএনপি নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। তারা নিজেদের ঘর সামাল দিতে পারছে না। তৃণমূলের সঙ্গে নেই কোনো যোগাযোগ। রাজনৈতিকভাবে গত এক বছরে দলটি কিছুই অর্জন করতে পারেনি।

এ বছর সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু ছিল পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি। সরবরাহ কমের অজুহাত দেখিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে পেঁয়াজের দাম। একপর্যায়ে তা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে কেজি বিক্রি হয় ২৫০ টাকার বেশি দরে। পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ইস্যুটি সর্বত্রই আলোচনায় স্থান পায়।
কিন্তু জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট এ ইস্যুতে রাজপথে দেখা যায়নি বিরোধীদের। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে কোনো প্রতিবাদও করেনি তারা। বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কার্যক্রম। শুধু পেঁয়াজ নয়, প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

যা সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে। কিন্তু সরকারবিরোধী কোনো দল এসব ইস্যুতে জনগণের পাশে দাঁড়ায়নি। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে কোনো চাপে ফেলতে পারেননি তারা।

এ বছর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল ডেঙ্গু। রাজধানীসহ সারা দেশে এ রোগটি প্রায় মহামারী আকার ধারণ করে। ডেঙ্গু আতঙ্কে রাজধানীবাসী নাজেহাল হয়ে পড়ে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় সবাইকে ভাবিয়ে তোলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খান দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

পূর্বপ্রস্তুতির অভাব এবং কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারি হিসাবে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১৪৪ জন মারা গেছে। যদিও বেসরকারি হিসাবে তা প্রায় ৩শ’। কিন্তু জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এ ইস্যুতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি বিরোধী দলগুলো।

নিহত এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত পরিবারের পাশেও তেমনটা দেখা যায়নি তাদের। কেন আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া হয়নি, এ অবহেলা কেন- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয়নি বিরোধী দলগুলো থেকে। জনগণের পক্ষ হয়ে তাদের কাছে কেউ জানতে চায়নি- এ রোগে মৃত্যুর জন্য দায়ী কে, এ দায় কার।
এ বছর জুলাই থেকে বাড়ানো হয় গ্যাসের দাম। আবাসিক ও বাণিজ্যিক উভয় ক্ষেত্রেই এ দাম বাড়ে। ফলে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু এ ইস্যুতেও বিরোধী দলগুলোকে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। রাজপথে তাদের উপস্থিতিও চোখে পড়েনি।

দাম বাড়ার পর এর প্রতিবাদ জানিয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি বা একটা প্রেস ব্রিফিং করেই দায় সারে দলগুলো। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপি সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে।
এসব কর্মসূচিতে সারা দেশে নেতাকর্মীদের রাজপথে দেখা গেলেও কেন্দ্রীয় ও মহানগরের নেতারা ছিল নিষ্ক্রিয়। নামকাওয়াস্তে কর্মসূচি পালন করেই তারা দায়িত্ব শেষ করে। অন্য কোনো দল বা জোট তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে মারার ঘটনা বছরের আলোচিত ঘটনার মধ্যে ছিল। এ ঘটনায় সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এ ইস্যুতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো দেশ। দোষীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন অনেকে।
কিন্তু এ ইস্যুতেও রাজপথে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি বিরোধী দল। বিএনপির অঙ্গসংগঠন মহিলা দল এ ইস্যুতে প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন করে। কিন্তু দলীয়ভাবে সারা দেশে কোনো প্রতিবাদ গড়ে তুলতে পারেনি।

এ ছাড়া এ বছর বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা, সরকারের ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান, বরগুনায় রিফাত ফরাজীকে কুপিয়ে হত্যা, চকবাজার ও বনানীর এফআর টাওয়ারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, কসবার মন্দবাগ স্টেশনে দুই ট্রেনের ট্রেন সংঘর্ষসহ এক ডজনের বেশি ইস্যু ছিল আলোচনায়। কোনো ইস্যুতেই রাজপথে দাঁড়ায়নি বিরোধীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *