চট্টগ্রাম, , বুধবার, ৩ মার্চ ২০২১

জাহেদুল হক আনোয়ারা প্রতিনিধি

এমডির দুর্নীতিতে ডুবছে ডিএপি সারকারখানা

প্রকাশ: ২০২০-০৩-১৬ ০০:২২:২৬ || আপডেট: ২০২০-০৩-১৬ ০০:৪৩:৩০


জাহেদুল হক, আনোয়ারা :
দরপত্র ছাড়াই কয়েকগুণ বেশি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামোগত কাজ করিয়েছেন। টাকাখড়ি ভালোই এসেছে নিয়োগ বাণিজ্যে। পরিবারের কাজে অফিসের গাড়ি ব্যবহারেও তার জুড়ি মেলা ভার। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে বড় অংকের উৎকোচ আদায়।

এতসব অভিযোগ ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট ফার্টিলাইজার কোম্পানী লিমিটেডের (ডিএপিএফসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে।


বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন-বিসিআইসি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ডিএপি সারকারখানাটি আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়ায় অবস্থিত। ২০১৯ সালের ১৩ জুন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পান আবদুর রহিম। এর আগে দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি একই কারখানার মহাব্যবস্থাপকের (অপারেশন) দায়িত্বে ছিলেন। কারখানায় দীর্ঘ দিন চাকরির সুবাদে ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে তার।


এমডির দায়িত্ব নেওয়ার পর দুর্নীতি-লুটপাট আর অনিয়ম-বিশৃঙ্খলায় আকণ্ঠ ডুবে আছে কারখানাটি। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে তত্ত্ব-তালাশ নেওয়া হয় না বললেই চলে। মাঝে মাঝে গণমাধ্যমের রিপোর্টে অনিয়ম-দুর্নীতির কদাকার চিত্র বেরিয়ে এলে নামমাত্র তদন্ত কমিটি হয়। বেশিরভাগ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট বা সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না।

অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতা বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় অবস্থার কাঙ্খিত পরিবর্তন হচ্ছে না।


এমডি কোনো ধরনের দরপত্র ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা,অবকাঠামো নির্মাণ কাজ করিয়েছেন। হাউজিং কলোনিতে একটি শহীদ মিনার বানানো হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে গড়েছেন ফুলের বাগান। এ কাজ করেছে খাজা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

এসব কাজে ওই প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাজ দুটিতে কোনো ধরনের দরপত্র আহবান করা হয়নি। যে কারণে রাষ্ট্রের অর্থ অতিরিক্ত ব্যয় করার সুযোগ পেয়েছেন এমডি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিক জানান, শহীদ মিনারে ৮ লাখ আর স্ট্রাকচার ডিজাইনসহ ফুলের বাগানে ১২ লাখেরও বেশি টাকা খরচ পড়েছে।

গত ১৬ ডিসেম্বর কাজ বুঝিয়ে দেন বলেও তিনি জানান। এছাড়া এমডি ডিএপি সারকারখানায় চাকরি করলেও থাকেন চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) হাউজিং কলোনিতে। এমডির ওই বাসা সাজসজ্জার খরচও মিটিয়েছেন ডিএপি সারকারখানার টাকায়।


অফিসের গাড়ি ব্যবহারেও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন এমডি আবদুর রহিম। নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা মিলে ডিএপি সারকারখানার তিনটি গাড়ি ব্যবহার করেন। যা অতীতে কোনো এমডিকে করতে দেখা যায়নি।

সূত্র জানায়,সরকারিভাবে এমডির একটি গাড়ি ব্যবহারের অনুমতি আছে। অথচ তার স্ত্রী এবং মেয়ে কারখানার আরেকটি গাড়িতে চড়ে শহরে আসা-যাওয়া করেন। এমডির বাসার দৈনন্দিন বাজার করার জন্য ব্যবহার করেন কারখানার জরুরি কাজে নিয়োজিত একটি পিকআপ। গাড়ির নম্বরগুলো হচ্ছে-চট্টমেট্রো-গ-১১-০৮২১,চট্টমেট্রো-গ-১১-০৮৫৭,চট্টমেট্রো-ঠ-১১-০১৯২। এসব গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণেও ব্যয় হয় কারখানার টাকা।


সম্প্রতি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ-টিআইসিআই থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২৮ জন জনবল কারখানায় শিক্ষানবীশ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পান। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর যোগদানের সময় তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ পেয়ে বিসিআইসির প্রধান নিরিক্ষা কর্মকর্তা সোহেল আহমেদ গত ১০ ফেব্রুয়ারি কারখানায় তদন্তে আসেন।

বর্তমানে ১৮১ জন অস্থায়ী শ্রমিক কারখানায় কর্মরত আছেন। এর বাইরে আরও শ্রমিক চেয়ে বিসিআইসির ডিরেক্টর বোর্ডে প্রস্তাবনা পাঠালেও তা অনুমোদন পায়নি। তা সত্ত্বেও গত বছরের অক্টোবরে দৈনিক ভিত্তিক মজুরিতে ১৬ জন শ্রমিককে মৌখিকভাবে নিয়োগ দেন এমডি। এসব শ্রমিকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কারও কাছ থেকে দুই লাখ আবার কারও কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা করে নিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভুক্তভোগী বলেন,নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমে একেক জনের কাছ থেকে একেক অংকের টাকা নিয়েছে। নিয়োগের কাগজপত্র এখনো পাইনি তবে আমাদেরকে অক্টোবর মাস থেকে বেতন দিচ্ছে।


নিয়ম অনুযায়ী কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রতি অর্থবছরে দুই সেট গ্রীস্মকালীন পোশাক দেওয়ার কথা রয়েছে। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর এ কাজে ব্লেজার বিডি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

কিছুদিন আগে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের এক সেট করে পোশাক দিলেও জুতো দেওয়া হয়নি। সরবরাহকৃত এসব পোশাক অতি নি¤œমানের বলেও অভিযোগ তুলেছেন শ্রমিকরা। এভাবে কারখানার নানা কিছু কেনাকাটার ক্ষেত্রে রীতিমতো পুকুর চুরির ঘটনা ঘটছে অহরহ। কমিশন বাণিজ্য এমডিকে অন্ধ করে রেখেছে বলেও জানান শ্রমিকরা।


এছাড়া পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে বড় অংকের উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব উৎকোচের টাকা সোনালী ব্যাংকে এমডির ব্যক্তিগত একাউন্টে জমা করেন ঠিকাদাররা। এভাবে নানা কায়দা- কৌশলে অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। এসব দেখভালের যেন কেউ নেই।

এমডির স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা বিরোধিতা করলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছে না। তবে কারখানাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষার জন্য অনেকেই নাম গোপন রেখে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।


এ ব্যাপারে ডিএপিএফসিএল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি মো.ইছমাঈল খাঁনের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। একই কথা বললেন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক মাসুদ জাহাঙ্গীরও।


এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে ডিএপি সারকারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুর রহিমের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *