চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

ঘুরে এলাম মা হালিমার বাড়ী – বিশ্বনবীর শিশুকালের স্থান

প্রকাশ: ২০১৮-০৮-৩১ ২১:২১:৩১ || আপডেট: ২০১৮-০৯-০১ ১১:১৪:০৬

ডা. তারেক আহমদ: সৌদি আরব থেকে :

মক্কা থেকে প্রায় ৯৫ কিমি দূরে তায়েফ শহর, এবং সেখান থেকে আরো প্রায় ৯০ কিমি দূরে সমূদ্রপৃষ্ঠ হতে ৫০০০ ফিট উপরে  #বনু_সাদ অঞ্চলে দুধমা হালিমা সাদিয়া ঘরে মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স.) লালিত পালিত হন। পরে তিনি নবুয়াত প্রাপ্ত হলে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফ শহরে আবার যান।

তৎকালীন আরবের, বিশেষ করে মক্কার প্রথানুযায়ী সম্ভ্রান্ত পরিবারের শিশুসন্তানদের জন্মের পর মরুভূমির মুক্তাঞ্চলে লালন পালনের ব্যবস্থা করা হতো। হযরত রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ৮-১০ দিন বয়সের যেকোন এক সময় বনু সাদ গোত্রের হালিমা সাদিয়া তাকে লালনপালনের জন্য তার মা আমেনার কাছ থেকে নিয়ে আসেন।

দুধমা হালিমা যখন হযরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) তার ঘরে নিয়ে আসেন তখন পাঁচ বছর বয়সী সায়মা নামে তার এক কন্যাসন্তান ও আবদুল্লাহ নামে একজন দুগ্ধপোষ্য পুত্রসন্তান ছিলো। নবী করিম (স.) কে লালনপালনের বিষয়ে সায়মা তার মাকে সাহায্য করতেন। হযরত রাসূলুল্লাহ (স.) কে গোসল করানো এবং বাইরে হাঁটাচলা করানোর দায়িত্ব সায়মা পরম স্নেহের সঙ্গে করতেন।

হালিমার ঘরে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর আগমনের পর পরিবারটির দারিদ্র্যবস্থা দূর হয়ে সচ্ছলতা ফিরে আসতে থাকে। তা ছাড়া দুধমা হালিমা লক্ষ করলেন, যেদিন মা আমেনা শিশু মুহাম্মদকে তার কাছে অর্পণ করলেন, সেদিন তার স্তন দুধে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। তিনি মক্কা থেকে তায়েফ ফেরার পথে লক্ষ করলেন, নবী করিম (স.) কে বহনকারী তার অপেক্ষাকৃত দুর্বল উটটি অন্য সবল উটের চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে চলছিলো। নিজ বাড়িতে ফেরার পর তিনি দেখলেন, তার মেষ ও দুম্বাগুলোর ওলান দুধে ভরপুর।

রীতি অনুযায়ী নবী করিম (স.) কে তার মা আমেনার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় হলে দুধমাতা হালিমা, দুধভাই আবদুল্লাহ ও দুধবোন সায়মা খুবই দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন। পরে আবার কোন একটি কারনে নবী করিম (স.) কে আবার লালনপালনের জন্য মা হালিমা সাদিয়াকে দেয়া হয়।

হালিমা সাদিয়া ঘরের পাশেই যেখানে রাসূলুল্লাহ(স.) খেলাধূলা খেলতেন, যেখানে দুধ ভাই বোনদের সাথে মেষ চড়ানোর সময় বিশ্রাম নিতেন, সেই গাছের একটি গাছের নীচে আল্লাহর নির্দেশে জিবরাইল (আ.) নবীর সিনা চাক করেছিলেন, অর্থাৎ আজকালের ভাষায় ওপেন হার্ট সার্জারি। রাসূলুল্লাহ(স.) এর রূহের/হার্টকে জমজমের পানি দিয়ে ধূয়ে পরিস্কার করে নূর দিয়ে ভরে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (স.) এর টোটাল চারবার এরকম সিনা চাক করা হয়েছিল বিভিন্ন জায়গায়।

হযরত হালিমার ঘর এবং গাছ এদু’টি দেখার জন্য প্রতিদিন সেখানে প্রচুর মানুষের আগমন ঘটে। তবে সেখানে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশের লোকজনের আগ্রহই বেশি। কোনো আরবকে সেখানে খুব একটা যেতে দেখা যায় না।

তাদের যুক্তি, হ্যাঁ হতে পারে নবী করিম (স.) এখানে জীবনের একটি অংশ কাটিয়েছেন। কিন্তু সেই স্থানের সঙ্গে তো ইসলামের কোনো বিধান সম্পৃক্ত নয়। সেখানকার কোনো ফজিলত বা মাহাত্ম্যের কথা আলাদাভাবে নবী করিম (স.) বলে যাননি। তাই সেই জায়গাকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করার কোনো অবকাশ নেই। তাহলে ওই জায়গাকে ঘিরে নানা ধরনের নতুন নতুন কর্মকাণ্ড-শিরক ঘটতে থাকবে। যার অনুমোদন ইসলামে নেই।

আসলেই বর্তমানে ঘঠনাটি তাই ঘঠেছে। এসব স্পটে দর্শনার্থীর ভ্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং যেখানে সেখানে নফল নামাজ পড়ার প্রবনতা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের, সৌদি সরকার এটাকে কঠোর ভাবে নিয়েছে। সৌদি সরকার কোন ধরনে বেদাত- শিরক খুবই কঠোর ভাবে দমন করে।

গত দুইদিন আগে আমরা একটি গ্রুপ গিয়েছিলাম সেখানে মক্কা থেকে প্রায় ৪ ঘন্টার মিনিবাস জার্নি করে। কিন্তু গিয়ে হালিমার ঘর এর কোন চিহ্ন ই দেখতে পেলাম না। ২-৩ বছর আগে যেখানে পাথর দিয়ে ঘরটি এবং গাছটি চিহ্নিত করে রেখেছিল তার সবগুলোই সৌদি সরকার বুলডোজার দিয়ে একাকার করে দিল। আর গাছটিকে কেটে পুরিয়ে দিল। এবং প্রতিদিনই যেসব গাড়ী সেখানে যায় তাদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করে পুলিশ। আমাদের মিনিবাস সহ আরো চারটি গাড়ীকে ৫০০রিয়াল করে জরিমানা করছে এখানে দর্শনার্থীদের আনার জন্য। মোট কথা সৌদি সরকারের মক্কার কাবা শরীফ এবং মদীনার মসজিদে নববী ছাড়া আর কোন কিছুতেই তাদের কোন আগ্রহ নেই।  সবকিছুই নিশ্চিন্ন করে দিচ্ছে।

হালিমা ঘরটি আমাদের চিহ্নিত করতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল। আমাদেরই একজন হাজী হঠাত জায়নামাজ এর অংশ বিশেষ দেখতে পেল পাথরের চাপে। এতে আমরা বুঝলাম এখানেই সেই বাড়ীটি ছিল, আর সিনা চাক করা সেই গাছটি এখনও ওখানে পরে আছে মাটি থেকে উবরানো অবস্থায়, তবে অনেকাংশে পুড়িয়ে ফেলেছে।

এরই কিছু দূর নিকটে দেখতে পেলাম কিছু দূর পর পর কয়েকটি পানির কুয়ো, যেখানের পানি নবী করিম(স.) পান করতেন। এতে বুঝা যায় এককালে এখানে বসতী ছিল।Q

পাহাড়ের পাদদেশে ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা বাতাসে, আমাদের স্মৃতিতে একে একে ভেসে উঠতে থাকে, এই সেই উপত্যকা যেখানে নবী করিম (স.) শিশু জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর কাটিয়েছেন। হ্যাঁ, হতে পারে চিহ্নিত করে রাখা হালিমার ঘর সেই আদিকালের ঘর নয়। আধাপুড়া সেই গাছটি সিনা চাক করা সেই গাছ নয়, হতে পারে তার পাশের গাছ, কিন্তু এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, এখানে বনু সাদের লোকজনের বসবাস ছিলো। সুতরাং সঙ্গতকারণেই, স্থানটির সঙ্গে মুসলমানদের আবেগ ভালবাসা জড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে ইতিহাসের একটি বিশাল অংশও।

লেখক:

(ডাঃ তারেক আহমদ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *