চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

Faruque Khan Executive Editor

ঝুঁকি নিয়ে ফেরা

প্রকাশ: ২০২১-০৮-০১ ১১:০৬:৫২ || আপডেট: ২০২১-০৮-০১ ১১:০৬:৫৮

চন্দনাইশ উপজেলার দক্ষিণ গাছবাড়িয়া এলাকার শাহানা আক্তার (৩৫)। উপজেলা থেকে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন দুপুর ২ টায়। সাথে ছিল ৫ বছরের এক ছেলে ও ৩ বছরের মেয়ে। ছেলেকে হাতে ধরে এবং মেয়েকে কোলে নিয়ে শাহানা আক্তার হেঁটে পার হয়েছেন নতুন ব্রিজ (শাহ আমানত সেতু)। এক কিলোমিটার হেঁটেই হাঁপিয়ে উঠছেন। পা যেন আর চলছে না। ব্রিজের শেষ প্রান্তে এসে যাত্রী ছাউনিতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছেন তিনজন। গন্তব্য বাকলিয়ার তুলাতলীতে। কাজ করেন তুলাতলী এলাকার একটি গার্মেন্টসে। বাসাও একই এলাকায়। 


জানতে চাইলে শাহানা আক্তার বলেন, ‘কাল থেকে (আজ রবিবার) থেকে গার্মেন্টস খুলবে। কিন্তু রাস্তায় কোন গাড়ি নেই। আমরা গার্মেন্টস শ্রমিকরা উড়ে উড়ে শহরে আসবো নাকি? সরকার গার্মেন্টস খোলার যখন অনুমতি দিয়েছে, গণপরিবহনও চালু করার অনুমতি দিত। তাহলে আমাদের এই ভোগান্তি হতো না। গ্রামে তাও সিএনজি ট্যাক্সি চলে, শহরে কোন পরিবহন নেই। ১০০ টাকার জায়গায় সাড়ে চারশ টাকা খরচ করে এখানে এসেছি। কিছুপথ সিএনজি ট্যাক্সি, কিছুপথ রিকশা এবং কিছু পায়ে হেঁটে এ পর্যন্ত এসেছি।

মইজ্জারটেকের পর কোন গাড়ি পাচ্ছি না। তাই পায়ে হেঁটেই ব্রিজ পার হয়েছি। না আসলে চাকরি থাকবে না। বাচ্চাগুলোকে নিয়ে শহরে আসতে কি যে কষ্ট হয়েছে আপনাকে বলে বুঝানো যাবে না’। 
শুধু শাহানা আক্তার নয়। এমন ভোগান্তির সঙ্গী হয়েছেন নগরীর উদ্দেশ্যে আসা প্রায় সব গার্মেন্টস শ্রমিকেরা। কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে আজ রবিবার থেকে খুলছে গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা। এসব শিল্পকারখানায় কাজে যোগ দিতে নগরীতে ফিরছেন শ্রমিকরা। করোনার ঝুঁকিসহ নানা ভোগান্তি সহ্য করেই নগরীতে প্রবেশ করাদের অধিকাংশই পোশাক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্য। গতকাল (শনিবার) সকাল থেকেই নগরীর প্রবেশ পথগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে। নগরীর শাহ আমানত সেতু, অক্সিজেন, সিটি গেট ও কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় দলে দলে মানুষ শহরে প্রবেশ করছে। পায়ে হেঁটে, ভ্যানে, মোটরসাইকেল যোগে ও ট্রাকে করে মানুষ নগরীতে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এসময় তারা গার্মেন্টস খোলা রেখে গণপরিহন বন্ধ রাখায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 


বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়ন থেকে ইপিজেডের উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন দম্পতি ইসমাইল ও মুন্নি। সাথে রয়েছে তিন বছরের কন্যা সন্তান। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ইপিজেড এর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। শাহ আমানত সেতু পার হয়ে রিকশা খুঁজছিলেন আগ্রাবাদ যাওয়ার জন্য। আড়াইশ টাকা দাবি করতেই রিকাশা চালকের উপর ক্ষেপে যান ইসমাইল। 
কথা হলে ইসমাইল বলেন, অনেক কষ্ট সহ্য করে কোন রকমে বাঁশখালী থেকে এ পর্যন্ত এসেছি। রাস্তায় কোন গাড়ি নেই। কর্ণফুলী ব্রিজ পর্যন্ত তাও রিকশা, ভ্যান, সিএনজি ট্যাক্সি ছিল। এখানে আসার পর তাও পাচ্ছি না। বাঁশখালী থেকে এটুকু আসতে ৫০০ টাকার বেশি খরচ হয়েছে। ভেবেছিলাম এখান থেকে একটি রিকশা নিয়ে আগ্রাবাদ, ওখান থেকে আরেকটি রিকশা নিয়ে ইপিজেড যাবো। তিনি বলেন, অফিস থেকে ফোন করে বলেছে, ১ আগস্ট থেকে গার্মেন্টসে যেতে, না হয় ঝামেলা হতে পারে। 


ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পেরিয়ে যারা চট্টগ্রাম এসেছেন শহরে ঢুকেই তাদেরকে পড়তে হয়েছে আরেক বিড়ম্বনায়। দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়ায় রিকশায় ইপিজেডসহ নানা গন্তব্যে তাদের অধিকাংশকেই যেতে হয়েছে। কেউ কেউ একে খান মোড় থেকে ছোট পিকআপ-এ করে ছুটেছেন ইপিজেড- পতেঙ্গা এলাকায়। জনপ্রতি দেড়শ-দুইশ টাকায় তাদেরকে গন্তব্যে যেতে খরচ করতে হয়েছে। 


নোয়াখালীর মাইজদি থেকে আসা এক ব্যক্তি জানান, ৫শ টাকায় দুই দফা মাইক্রো-ট্রাকে চড়ে চট্টগ্রামের সিটি গেটে এসেছেন। প্রতিটি গাড়িতেই গাদাগাদি করে যাত্রী নিয়ে যানবাহন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে এসেছে। গাড়ি না পেয়ে বহু লোক ফেনীতে এসে আটকা পড়েছে বলে উল্লেখ করে ওই ব্যক্তি জানান, ফেনী থেকে আসার জন্য কাভার্ডভ্যান, ট্রাকে যাত্রীপ্রতি গুণতে হয়েছে কমপক্ষে দুইশ টাকা।


ঈদের ছুটি ও ৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘লকডাউনের ছুটি’ কাটাতে অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ গ্রামে ফিরে যায়। হঠাৎ করে ১ আগস্ট থেকে কারখানাগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে ‘চাকরি বাঁচাতে’ দূর-দূরান্ত থেকে শহরে ফিরছেন তারা। বেশ কয়েকজন গার্মেন্টস শ্রমিক বলেন, ১ আগস্ট থেকে চাকরিতে যোগ দিতে ফোন করা হয়েছে। কাজে যোগ না দিলে চাকরি থাকবে না বা বেতন কাটা হবে বলে জানানো হয়েছে। তাই তারা চরম ভোগান্তি ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে কর্মস্থলে যোগ দিতে নগরীতে প্রবেশ করছেন। 
অন্যদিকে, লকডাউন পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত গ্রামে অবস্থানরত কোন পোশাক শ্রমিক-কর্মচারী কারখানায় কাজে যোগদান করতে না পারলে তার বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হবে না বলে জানিয়েছে পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ।


করোনার সংক্রমণ রোধে গত ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে আগামী ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। এসময় খাদ্যপণ্য উৎপাদন-প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া পরিবহন-সংরক্ষণ ও ওষুধ খাত ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহনসহ শিল্প কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই ঘোষণার পর গার্মেন্টস মালিকেরা রপ্তানিমুখী বিবেচনায় গার্মেন্টস কারখানা খুলে দিতে সরকারের কাছে দফায় দফায় অনুরোধ জানায়। এরপরই গত শুক্রবার রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *