চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

admin

কারিতাসের সুফল প্রকল্পে সফল ৬ শ নারী

প্রকাশ: ২০১৮-০৪-২৮ ০১:০৮:১৭ || আপডেট: ২০১৮-০৪-২৮ ০১:০৮:১৭

 

আব্বাস হোসাইন আফতাব,  রাঙ্গুনিয়ায় থেকে:

গৃহিনী শহর বানু (৪৫) টানাটানির সংসারে অনেকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন।  দিনমজুর স্বামী আলমের মাসিক আয় মাত্র দুই হাজার টাকা।  নুন আনতে পান্তা পুরানোর মত অবস্থায় তাঁর সংসারে অভাব লেগেই থাকত।   দুই ছেলের পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।  এই সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস তাঁদের সংসারে আশির্বাদ হয়ে আসে।  শহর বানুর বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস দূর্গম এলাকার মুসলিম পাড়ায় ।  শহর বানুর মতো উপজেলার ছয়শত নারী কারিতাসের সহযোগিতায় এখন স্বাবলম্বী।  তাঁরা এখন ঘুরে দাড়িয়েছে।

অনেকেই সংসারের হাল ধরেছে। শহর বানু বলেন, “ কয়েক বছর আগেও সংসারের অভাব পিছু ছাড়েনি।  এক বেলা খেলে অন্য বেলা খাবার জুটাতে কস্ট হতো।  এখন আর সেই অভাব নেই।  বড় ছেলে মো. জাহাঙ্গীর ১০ম শ্রেণি ও ছোট ছেলে আবুল কাসেম ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে।  ”

তাঁর সফলতা কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে মাছ চাষের জন্য কারিতাসের উপকরণ সহায়তার জন্য নির্বাচিত হন ও প্রশিক্ষণ নেন।  গ্রামের একটি পুকুর লিজ নিয়ে শুরু করেন মাছ চাষ।  অল্প কদিনে পুকুরে মিশ্র মাছ মাগুর, শিং, কার্প ও নাইলোটিকা মাছ বড় হতে থাকে।  কয়েক মাস পর মাছ বিক্রি করে দশ হাজার টাকায় পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা লাভ হয় তাঁর।

২০১৭  সালের কারিতাস থেকে গবাদি পশু, পাখি পালন ও শাকসব্জি চাষের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে শাকসব্জি চাষ, গাভী ও মুরগী পালন শুরু করেন।  বাড়ির আশে পাশে ক্ষুদ্র খামার করে তাঁর বাছুরসহ ৩টি গরু, ২০ টি মুরগী রয়েছে। বাড়ির আশে পাশে রয়েছে বিভিন্ন রকমের মৌসুমী সবজি খেত।  প্রতি মাসে এখন তাঁর মাসিক আয় বার থেকে চৌদ্দ হাজার টাকা।  মাছ চাষে তার সফলতা দেখে গ্রামের  পাঁচ জন কৃষক উন্নত পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন।  মাছ চাষে সফলতার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর থেকে তিনি গত বছর উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ মৎস্য চাষী’র পুরষ্কার পান।

তিনি বলেন, “বাস্তবমূখী প্রশিক্ষন পেয়ে মাছ চাষ, শাক-সবজি উৎপাদন, হাস-মুরগী পালনে উন্নত পদ্ধতি অনুসরন করায় আশানুরুপ ফল পেয়েছি। ”সফল নারী উপজেলার হোছনাবাদ ইউনিয়নের নিশ্চিন্তাপুর গ্রামের গৃহিনী সেলিনা আক্তার (৩২) বলেন , তাঁর স্বামী চায়ের দোকানে চাকুরী করে।  তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে আশরাফ আলী নবম শ্রেণি ও দ্বিতীয় ছেলে আরাফাত আলী এখন চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে।  এক সময় তাঁদের সংসার চালানো কঠিন হতো ।  এখন সেই অবস্থা তাঁদের নেই।   গত বছরের মাচ মাসে কারিতাসের সাথে যুক্ত হয়ে তাঁদের ভাগ্য বদলে গেছে।

প্রথমে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাঁদের নিজের ৩ শতক  বসতভিটায়  অল্প পুঁজিতে কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি, হাঁস-মুরগির খামার, বস্তায়  মিষ্টিকুমড়া, পুঁইশাক, ডাটাশাক, বারমাসী মরিচ, চালকুমড়া চাষ করে।  পাশাপাশি মুরগি ডিম তা দেওয়ার জন্য হাজল তৈরি করে বিক্রি করেন।  গ্রামের তাঁর তৈরি হাজল বিখ্যাত।  প্রতি মাসে এখন তাঁর প্রতি মাসে আয় আট থেকে দশ হাজার টাকা।

তার কার্যক্রম দেখে গ্রামের সাহেদা আক্তার, নাছিমা বেগম, সুফিয়া বেগম, আনোয়ারা বেগম, মনসুর আক্তার ও লাভলী আক্তার কম্পোস্ট সার ও বসতভিটায় শাকসবজি উৎপাদন ও মুরগির তা দেওয়ার হাজল তৈরি করে প্রতি মাসে বাড়তি টাকা আয় করছেন। সেলিনা আক্তার বলেন, “ ভবিষ্যতে বড় পরিসরে কেঁচো কম্পোষ্ট সার কারখানা করবেন।  তাঁর স্বপ্ন গ্রামের সবাই নিরাপদ সব্জি চাষের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।  ”

কারিতাসের সহকারী মাঠ কর্মকর্তা গৌরি ভট্টাচার্য্য বলেন, অতি দরিদ্রের মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই উপজেলার পদুয়া, সরফভাটা ও হোছনাবাদ ইউনিয়নের দূর্গম গ্রামে কারিতাস (সুফল- SUFOL)(সাস্টেনব্ল ফুড সিকিউরিটি লাভ্লিহুড) স্থায়িত্বশীল খাদ্য ও জীবিকায়ন নিরাপত্তা প্রকল্পের কাজ শুরু করেন।  এই প্রকল্পে দুইশ আদিবাসী ও আটশ বাঙ্গালী মিলে এক হাজার উপকারভোগী রয়েছে।  এর মধ্যে ছয়শত সফল নারী উপকারভোগী রয়েছে। প্রকল্পে বিনামূল্যে সচেতনতা মুলক প্রশিক্ষণ মাছ চাষ,  সবজি চাষ, ধান , হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন, বাজারজাতকরণ, আবহাওয়া তথ্য প্রেরণ, খাদ্যের পুষ্টি গুন আলোচনা, মাঠ দিবস পালনসহ  উপকারভোগীদের সচেতন করা হয়।  উপকারভোগীদের মাঝে ভার্মি কম্পোষ্ট সার, বীজ ধান বিতরণ, মাছ চাষের জন্য খাবার বিতরণ, মুরগি ও গরু-ছাগলের ঘর তৈরি করে দেয়া হয়।

এছাড়া গবাদী পশু ও হাঁস মুরগীর ভ্যাকসিনও দেয়া হয়। প্রকল্পের জুনিয়র কর্মসূচী কর্মকর্তা সত্যেন্দ্র চন্দ্র রায় বলেন, কারিতাস স্থায়িত্বশীল খাদ্য ও জীবিকায়ন নিরাপত্তা প্রকল্পের মাধ্যমে হত দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া অসহায় মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রকল্পের কার্যক্রম চালাচ্ছে।  উপজেলার ৫টি গ্রামের কৃষকরা নিজ উদ্যোগে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে কম্পোষ্ট সার উৎপাদন করে চাষাবাদ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।  সফল ছয়শ নারী পিছিয়ে পড়া জনপদে এখন মডেল।

উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ নিরাপদ জীবন যাত্রার স্বপ্ন দেখবে। উপজেলা নির্বাহী মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, “ দূর্গম এলাকায় কারিতাসের এই কার্যক্রমে সত্যিই প্রশংসনীয়।  গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া নারীরা এখন বিষমুক্ত সব্জি উৎপাদন ও গবাদী পশু পালনে সফল হয়েছে।  অন্যান্য নারীরাও তাঁদের অগ্রযাত্রা অনুসরন করলে জীবনে সফলতা আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *