চট্টগ্রাম, , বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

admin

রাঙ্গুনিয়ার সনির স্বপ্ন পূরন হবে কি ?

প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২২ ০১:০০:২৮ || আপডেট: ২০১৮-০৫-২২ ০১:০০:২৮

আব্বাস হোসাইন আফতাব,  রাঙ্গুনিয়া প্রতিনিধি :

বেড়ার ঘর আর টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি তিন কক্ষের ঘরটি সনি নাথের। বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঝলমলে সূর্যের আলো ঢুকছে এই ঘরে। নড়বড়ে ঘরটিতে থাকেন সনি ও তার মা রুনু নাথ। ভিতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় লম্বা বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেত। শীতল পাটি ও আর মোড়া বানিয়ে সংসার চলে তাঁদের। এবার এসএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রামের উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে একমাত্র গোল্ডন এ প্লাস পায় সনি। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার বাবা মারা যান। সেসময় তিনি ভ্যান গাড়ি চালাতেন। দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে সনি। বাবার মৃত্যুর পর মা শীতল পাটি বানিয়ে সংসার চালালেও মেয়েকে কখনো কোন কাজ করতে দেয়নি। মায়ের শীতল পাটি বানানোর টাকায় জীবনে বড় সাফল্য আসে সনি নাথের। এ বিদ্যালয়ে ৭ জন এ প্লাস পেলেও একমাত্র গোল্ডেন এ প্লাসটি সনি। সে পিইসি ও জেএসসিতেও এ প্লাস পায়।

শুক্রবার বিকেলে লালা নগরের বাক্ষ্মন পাড়া এলাকায় তার বাড়িতে গেলে কথা হয় তার সাথে, সে বলে, “বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখছি মা দিনরাত পরিশ্রম করছে। কিন্তু কোনদিন আমাদের কোন কাজে পাঠায়নি এবং করতেও দেয়নি। শুধু পড়ালেখা করে যেতে তিনি সবসময় উৎসাহ যুগিয়েছেন। আমি পিইসি পরীক্ষায় উত্তর রাঙ্গুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এ প্লাস পায়। এসময় বিদ্যালয়ের কাদের স্যার আমাকে সবদিক থেকে সহায়তা করতো। এরপর উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে টানা তিন বছর খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করি। সেখানে জেএসসি পরীক্ষাতেও এ প্লাস পায়। এরপর বিদ্যালয়ের স্যারদের পরামর্শে এবং নিজের ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করতে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা করা শুরু করি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের মঈনুল স্যার আমাকে ফ্রিতে গণিত ও বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো এবং পাশর্^বর্তী উত্তর রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রী কলেজের মো. আলমগীর স্যার আমাকে ইংরেজী পড়াতেন। এভাবে সবার সহযোগিতায় আমি কঠোর অধ্যাবসায় করে এসএসসিতেও গোল্ডেন এ প্লাস পায়।

সনি নাথের মা রুনু নাথ বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ের মধ্যে সনি নাথ বড়। সনির বাবা সুভাষ নাথ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর ভ্যান চালানোর টাকা দিয়ে চলতো তাদের সংসার। ২০১১ সালে তখন সনি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। একদিন তার বাবার খুব অসুখ হয়। হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও বাঁচানো যায় না তাকে আর। তখন থেকেই গৃহিনী কাজের পাশাপাশি শুরু করি সন্তানদের মানুষ করার কাজ। শখের বসে শেখা শীতল পাটি বানানোর কাজকে জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করি। রাতদিন পাটি বানায়। পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের যেকোন গৃহস্থলি কাজে যে যেখানে ডাকে সেখানেই গিয়ে শ্রম বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যায়। গত দীর্ঘ ৭ বছর সন্তানদের মানুষ করতে এভাবেই কষ্ট করে চলেছি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাকে তার এই ইচ্ছের কথা বার বার বললেও আমি তাকে আশ^স্ত করি। কিন্তু আমি জানি না তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাকে শেষ পর্যন্ত সহায়তা করতে পারবো কিনা।’

উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ সনি নাথ ২০১৮ সালে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভাল ফলাফল করে বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক ধনী ঘরের শিক্ষার্থী থাকলেও সনি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু এই সনি ছিল মেধার দিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগীতা করেছি। তার উচ্চ শিক্ষায় সকলের সার্বিক সহযোগীতা প্রয়োজন।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য কাজী মঈন বলেন, ‘সনি নাথ আমার গ্রামের গর্ব। আমি অনেক আগে থেকেই তার পড়ালেখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা করে চলেছি। তার মা বিধবা ভাতা পাই। সমাজের সকলে যদি এগিয়ে আসেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী সনি অকালে ঝড়ে যাবে না।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘সনি নাথ দারিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে বড় সাফল্য পেয়েছে। তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বাত্বক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *