চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬

বীর কন্ঠ ডেস্ক কন্ট্রিবিউটর

সবুজ ও মানবিক এক শিক্ষা অফিসের গল্প

প্রকাশ: ২০১৮-১০-১৯ ০০:৫৭:১৮ || আপডেট: ২০১৮-১০-১৯ ০০:৫৭:১৮

মোহাম্মদ ইলিয়াছ:

জিনু কুমার বড়ুয়া ২০১২সালে নারিশ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে অবসরে যান। বলতে গেলে ২০১২ সাল থেকে তাঁর আর লোহাগাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসে আসা হয়নি। সম্প্রতি তাঁর ছোট মেয়ে রিম্পা বড়ুয়া সহকারী শিক্ষক হিসেবে নারিশ্চা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। মেয়েকে যোগদান করাতে দীর্ঘ দশ বছর পর লোহাগাড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসে তাঁর পা পড়ে এবং তিনি অবাক! শিক্ষা অফিসের বারান্দায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকদের বসার জন্য টেবিল ও বেঞ্চ পেতে দেওয়া হয়েছে। তিনি সেখানে বসলেন এবং মেয়ে বসলো ‘সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের বসার স্থান’ চিহ্নিত টেবিল ও বেঞ্চে। অবসর প্রাপ্ত শিক্ষকদের বসার স্থানে তাকে বসা দেখে উপজেলা শিক্ষা অফিসে বর্তমানে কর্মরতরা তাঁর সাথে আগবাড়িয়ে কথা বলেন।

জিনু কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘এতদিন পরে উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসে নিজেকে এক মুর্হূতের জন্য অপাংক্তেয় মনে হয়নি। আমার সাথে স্যারেরা যেভাবে কথা বলেছেন এবং দ্রুততার সাথে যেভাবে আমার মেয়ের অফিসিয়াল কাজ করে দিয়েছেন সত্যি আমি অভিভূত। ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন’।

 

সম্প্রতি সরকারি বরাদ্দ দিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস ঢেলে সাজানো হয়েছে। পুরো অফিসে টাইলস লাগানো হয়, দীর্ঘদিন ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে থাকা টয়লেট সংস্কার করা হয়, প্রতিটা জানালায় থাই গ্লাস ও পর্দাসহ পুরো অফিস ঝকঝকে করে সাজানো হয়েছে।

 

উপজেলা শিক্ষা অফিসে এসে মনে হয়েছে আমি যেন এক খন্ড বাগানে এসেছি। আটাশ টা ফুলের টব নিচে বসানো হয়েছে আর পঁচিশটা টব ঝুলানো হয়েছে যার নাম দেওয়া হয়েছে, ‘শিক্ষা ঝুলন্ত উদ্যান’।

অফিসে ঢুকতেই চোখে পড়ে চীনা প্রবাদ- ‘যদি এক বছরের পরিকল্পনা কর তবে শস্য বপন কর; যদি দশ বছরের পরিকল্পনা কর তবে বৃক্ষ রোপণ কর আর যদি একশো বছরের পরিকল্পনা কর তবে সন্তানকে শিক্ষিত করো’। অফিসের ভিতরে আরেক জায়গায় লেখা আছে, ‘আগামীকালের কাজ আজকে, আজকের কাজ এখনই’।

 

উপজেলা শিক্ষা অফিসে বিনামুল্যে কি কি সেবা পাওয়া যাবে তার বিবরণ সম্বলিত সিটিজেন চার্টার দৃশ্যমান জায়গায় সাঁটানো হয়েছে। তার পাশের দেয়ালে রয়েছে নোটিশ বোর্ড।

 

অফিসের সামনে রয়েছে অভিযোগ বক্স এবং প্রতি মাসেই অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয় বলে জানান উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ আকরাম হোসেন।

উত্তর হরিণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক আহমেদ হোসেন বলেন, আমার ত্রিশ বছর চাকরি জীবনে এমন মানবিক, শিক্ষা ও সবুজ বান্ধব অফিস আর দেখিনি।

 

সম্প্রতি উপজেলা শিক্ষা অফিস কর্তৃক আয়োজিত নবনিযুক্ত সহকারী শিক্ষক বরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা সহকারী শিক্ষক শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘চাকরির শুরুতেই যেভাবে রজনীগন্ধার স্টিক দিয়ে আমাদের বরণ করে নেওয়া হলো সত্যি আমরা অভিভূত। স্যারদের কথা ও বরণ দীর্ঘদিন শ্রেণিকক্ষে আমাদের প্রেরণা জোগাবে।

দুই তরুন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ওমর ফারুক ও মুসলিম উদ্দিন জানান, শোনার চেয়ে দেখার স্থায়িত্ব টেকসই। এই অফিসে প্রতিদিন অনেক শিক্ষকসহ সেবাপ্রার্থীরা আসেন। অফিসের শিক্ষা ঝুলন্ত উদ্যান দেখে গিয়ে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে বাগান করতে অনুপ্রাণিত হবেন। বিদ্যালয়ের বাগান দেখে ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়িতে বাগান করতে, চারা লাগাতে অনুপ্রাণিত হবে। এভাবে সবুজ ছড়িয়ে পড়বে এবং এই বিশ্বাস থেকে আমরা ঝুলন্ত উদ্যান করেছি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাসরিন সুলতানা বলেন, লোহাগাড়া শিক্ষা অফিসের কার্যক্রম জেনে উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের সমন্বয় সভায় বলেছি এবং চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলা শিক্ষা অফিসকে এমন শিক্ষক বান্ধব ও সবুজাভ করার জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসারদের আহ্বান জানিয়েছি।

লোহাগাড়ার উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু আসলাম বলেন, ‘কিছুদিন আগে উপজেলা শিক্ষা অফিসের ঝুলন্ত উদ্যান উদ্বোধন এবং নতুন শিক্ষকদের বরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে উপজেলা শিক্ষা অফিসে যাই। শিক্ষা কর্মকর্তাদের ইনোভেটিভ কার্যক্রম আমাকে অভিভূত করেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষা অফিস যদি এভাবে ভাবে তাহলে মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভবপর হয়ে উঠবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতাও মোকাবেলা করা যাবে’।

সহযোগী অধ্যাপক 

আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *