আবদুল হাকিম রানা
পটিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০১৮-১১-০৩ ১৭:৫২:৪০ || আপডেট: ২০১৮-১১-০৩ ১৭:৫২:৪০
আবদুল হাকিম রানা, বীর কন্ঠ :
পটিয়ায় অবশেষে চট্টগ্রাম-দোহাজারী শাখা রেল লাইনে দুটি নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। আজ রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পটিয়া জংশন রেল স্টেশনে আয়োজিত বর্ণাঢ্য এক অনুষ্ঠানে লাইন ম্যানের ভূমিকায় সবুজ পতাকা নেড়ে এ দুটি ট্রেনের আনুষ্ঠানিক চালু কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ১৬টি রেলওয়ে স্টেশনে রেল যাত্রীদের মাঝে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এ উপলক্ষে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোতাহেরুল ইসলাম চৌধু
রীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ, পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য মঈনুদ্দীন খান বাদল, সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম চৌধুরী, রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব তোফাজ্জেল হোসেন, পরিচালক জেনারেল রবিউল আলম, বাংলাদেশ রেলওয়ের জিএম সৈয়দ ফারুক আহমেদ, দক্ষিণ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পদাক মফিজুর রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন পটিয়া পৌর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র অধ্যাপক হারুনুর রশিদ ও উপজেলা আ’লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল খালেক চেয়ারম্যান।
এসময় রেল মন্ত্রী মুজিবুল হক এমপি বলেন, দেশজুড়ে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় রেলওয়ের নেটওয়ার্কিং কার্যক্রমের পরিধি আজ সারাদেশে বিস্তৃত হচ্ছে। অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় এসে রেল বিভাগকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংশ করে দিয়েছিল। তারা এক দিনেই গোল্ডেন হেন্ডশেকের নামে ১৩ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে রেল বিভাগ থেকে বিদায় করে দিয়েছিল। তারা সেসময়ে রেল এর উন্নয়নে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ জাতির পিতার কন্যা ÿমতায় এসেই ২০১১ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে নতুন রেল মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করেন। আজ এ মন্ত্রণালয়ের সুফল দেশবাসী পেতে শুরু করেছে। বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য ৪৬টি নতুন ইঞ্জিন, ২৪০ কোচ বগি এবং আরো নতুন নতুন বগি আমদানীর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ট্রেন চলাচলে চুক্তির মাধ্যমে পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম সহ দেশের সকল বিভাগীয় শহরে দ্রুত যাতায়তের জন্য বুলেট ও ইলেকট্রিক ট্রেন এবং পাতাল ট্রেন চালুর প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা আশা করি যদি আবার আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পায় তাহলে রেল বিভাগ সহ সকল ক্ষেত্রে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ট নেতৃত্বে সল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়শীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করা। তিনি এ সরকারের সফল নীতির বিষয় তুলে ধরে বলেন, আজ বন্ধ হওয়া চট্টগ্রাম-দোহাজারী শাখা লাইনের দুটি ট্রেন চালুর মাধ্যমে এ অঞ্চলে রেল যাত্রীদের দাবী পূরণ হল। তিনি এ রেল লাইনকে কক্সবাজার এবং মায়ানমারের ঘুমধুম পর্যন্ত সম্প্রসারণে চলমান কার্যক্রম তুলে ধরে বলেন, শেখ হাসিনাকে আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আনার জন্য পটিয়া সহ সর্বত্র নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করতে হবে।
পটিয়ার সাংসদ সামশুল হক চৌধুরী বলেন, এটি একটি লাভজনক রেল শাখা লাইন। এটির গুরুত্ব বিবেচনা করে ব্রিটিশ আমলেই এ রেল লাইনে ট্রেন চালু করেছিল বিট্রিশ সরকার। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার এ লাইনের ট্রেন গুলো বন্ধ করে দেয়। আমি নূন্যতম ৫০ বার রেলমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করে এ লাইনে নতুন ট্রেন সার্ভিস দেওয়ার জন্য মন্ত্রীকে অনুরোধ করায় তিনি আজ এ ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও চাকুরীজীবী সহ সব মানুষের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ট্রেনের সময়সূচি সুবিধামত সময়ে আনা সহ এ লাইনে আরো এক জোড়া নতুন ট্রেন চালুর দাবি জানান। বোয়ালখালীর এমপি মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, এ লাইনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কালুরঘাট সেতু। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে নতুন সেতু নির্মাণে ৯শ কোটি টাকা প্রয়োজন। কোরিয়া সরকার ৬শ কোটি টাকা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আমাদের সরকারকে দিতে হবে মাত্র ৩শ কোটি টাকা। এটি মন্ত্রী পরিষদে অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু একনেকে কেন উঠেনি তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। তিনি অবিলম্বে যানমালের নিরাপত্তা বিধানে এ সেতু নির্মাণে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশিøষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষন করেন। চন্দনাইশের এমপি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নতুন করে এ ট্রেন চালু হওয়ায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৫০ সালের দিকে চট্টগ্রাম-দোহাজারী শাখা রেল লাইনে ৬ জোড়া ট্রেন চলাচল শুরু হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের আমলে এ শাখা লাইনে লোকসানের অজুহাতে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে এক জোড়া ট্রেন চালু রাখা হয়। পরে এটি ২০০০ সালের ১ অক্টোবর বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। বছর খানেক পর ২০০২ সালে ১৫ জানুয়ারি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে তা বুঝিয়ে দেয়া হয়। ২০১৩ সাল থেকে এ লাইনে দোহাজারী পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য ফার্নেস তেলবাহী ওয়াগন ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সঙ্গে চলতো যাত্রীবাহী একটি ট্রেন। নতুন একজোড়া ট্রেন চালু হওয়ায় এখন যাত্রীবাহী ট্রেনের সংখ্যা ৪টি তে দাঁড়ালো।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান সরকারের আমলে পটিয়া ইন্দ্রপোল শিল্পাঞ্চলের পরিশোধিত লবণ পরিবহন করে পটিয়া রেলওয়ে স্টেশন বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় রাষ্ট্রীয়ভাবে গোল্ড মেডেল অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এব্যাপারে উদ্যোগের অভাবে এ শাখা লাইনটি মুখ থুবড়ে পড়ে।
পটিয়া স্টেশন মাস্টার সনজিব দাশ জানান, চট্টগ্রাম-দোহাজারী শাখা লাইনে নতুন ১১১নং আপ নামে চালুকৃত ট্রেন সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়ে ঝাউতলা, চট্টগ্রাম পলি:, ষোলশহর জংশন, জান আলী হাট, গোমদন্ডী, বেঙ্গুরা, ধলঘাট, খানমোহনা পাড়ি দিয়ে পটিয়া পৌঁছবে ১২ টা ৩৬ মিনিটে। এরপরে ট্রেনটি চক্রশালা, খরনা, কাঞ্চননগর, খানহাট, হাশিমপুর হয়ে দোহাজারীতে পৌঁছবে দুপুর ২ টায়। বিকাল ৩ টায় ট্রেনটি ১১২ নং হয়ে ডাউন হিসেবে দোহাজারী থেকে ছেড়ে পটিয়া পৌঁছবে ৪ টা ৩৬ মিনিটে। এতে একেক করে এটি আবারো ১৬টি ষ্টেশনে যাত্রী উঠানামা করে চট্টগ্রামে পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬ টায়। এরপরে ১১৩নং হয়ে এটি আবার চট্টগ্রাম থেকে সন্ধ্যা ৭ টায় রওনা দিয়ে পটিয়া পৌঁছবে ৮ টা ৩৬ মিনিটে আর এটি দোহাজারী পৌঁছবে রাত ৯ টায়। আবার ট্রেনটি ১১৪নং ডাউন হয়ে দোহাজারী থেকে পরদিন সকাল ৬ টা ৪০মি: ছাড়বে এবং পটিয়া পৌঁছাবে ৭ টা ৫২ মিনিটে আর চট্টগ্রামে পৌঁছাবে ৯ টা ৩০ মিনিটে।