জাহেদুল হক
আনোয়ারা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-২৯ ০০:০২:০২ || আপডেট: ২০১৯-০৪-২৯ ০০:০৩:০২
জাহেদুল হক, আনোয়ারা :
যে দিনটি এলে উপকূলবাসী এখনো আঁতকে উঠে সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল আজ। ১৯৯১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে আঘাত হানে ঘন্টায় ২৫০ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। ছয় মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় পুরো উপকূল। ওই দিন শুধু আনোয়ারা উপকূলের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। প্রলয়ংকরী সেই ঝড়ের ২৮ বছর পর আজও অরক্ষিত আনোয়ারা উপকূল।যার ফলে প্রতি বছর বর্ষা এলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন উপকূলের বাসিন্দারা।
এদিকে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টঘূর্ণিঝড় ‘ফনি’আতঙ্কে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন উপকূলবাসী। তারা বলছেন,বর্ষার আগে বাঁধ নির্মাণ শেষ না হলে আগামীতে ব্যাপক হারে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।নিয়মিত সামুদ্রিক জোয়ারের লোনা পানিতে উপকূলীয় এলাকা ডুবভাসি করবে। মাছের ঘের, ফসলি জমি, জনবসতি প্লাবিত হবে। তবে বেড়ি বাঁধ রক্ষণা বেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন আনোয়ারা উপকূলের কোথাও দুর্বল বাঁধ নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, আনোয়ারা উপকূলে ১৮০ কোটি টাকার ৬৪.৩২৯ কিলোমিটার এলাকায় বেড়ি বাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে সিসিব্লক, জিওব্যাগ ও বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে। ইতি মধ্যে ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যেই দীর্ঘ মেয়াদী এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপকূল বাসীর কষ্ট লাঘব হবে।
উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের গহিরা উপকূলের বাসিন্দা ছালেহআহমদ জানান, বর্তমানে তাদের এলাকায় বেড়ি বাঁধের কাজ হচ্ছে। কিন্তু শতভাগ মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরির কথা থাকলেও সে নিয়ম মানছেন না ঠিকাদাররা। পাশাপাশি বেড়ি বাঁধের বাইরে দেওয়ার জন্য সিসিব্লক তৈরির কাজেও ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। নিম্নমান সামগ্রী দিয়ে ব্লক তৈরি করায় সেগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই ভঙ্গুর অবস্থায় পরিণত হচ্ছে। এতে উপকূল বাসীর নিরাপত্তা দিন দিন আরও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় জন প্রতিনিধিরাও এই অনিয়মের পক্ষে কথা বলেছেন। রায়পুর ইউনিয়নের পূর্ব গহিরা ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ ইসমাঈল বলেন,সঠিক তদারকির অভাবে বেড়ি বাঁধের কাজ চলছে ইচ্ছেমতো। বাঁধ নির্মাণে মাটির পরিবর্তে বালি ব্যবহার হচ্ছে বেশি। এভাবে কাজ চলতে থাকলে বেড়িবাঁধ স্থায়ী হবেনা। এ ব্যাপারে রায়পুরইউপি চেয়ারম্যান জানে আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কাজের মান ভালো হচ্ছে না জানিয়ে তিনি এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
স্থানীয়দের মতে,১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পুরোপুরি বিলীন হয়ে গিয়েছিল আনোয়ারা উপকূলের ১৪ কিলো মিটার বেড়ি বাঁধ। এরপর বিভিন্ন সময় বেড়িবাঁধ সংস্কার ও রিং বাঁধ নির্মাণের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিলেও তাতে দুঃখ ঘুচেনি উপকূলবাসীর। দীর্ঘ দিন পর পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান ২৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে আনোয়ারা উপকূলীয় বাঁধের জন্য। তবে অভিযোগ কাজের ধীরগতি ও অনিয়ম নিয়ে।
এ প্রসঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো.কায়সার উদ্দিন প্রকল্প কাজে অনিয়মের কথা অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের কাজ শেষে টাস্কফোর্স কাজের মান যাচাই করেন। সেখানে কাজে অনিয়ম বা দুর্নীতি করার সুযোগ নেই।
সরেজমিন দেখা যায়, আনায়ারা উপকূলীয় বাঁধের গহিরা বার আউলিয়া অংশে কিছু ব্লক বসানো হলেও বাঁধের ১৩১০ মিটার এলাকা রয়েছে ভাঙাচোরা অবস্থায়। পূর্ব গহিরা ফকির হাট ও হাড়িয়া পাড়া অংশের ৭১০ মিটার এলাকায় বেড়ি বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ব্লক বসানোর কথা থাকলেও দুই বছরেও কাজ শেষ হয়নি। একই অবস্থা জুঁই দন্ডী ইউনিয়নের লামার বাজার ও খুরু স্কুল গোদার পাড় এলাকার।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে সরকারি হিসাব মতে আনোয়ারায় মারা যায় ১৭ হাজার মানুষ। তবে স্থানীয়দের মতে এ সংখ্যা কমপক্ষে ২৫ হাজার। তাদের প্রায় সবাই উপকূলীয় ইউনিয়ন রায়পুর ও জুঁইদন্ডীর। তাছাড়া গবাদি পশু,বাড়িঘর,দোকানপাট,মসজিদ-মন্দির,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ ফসলেরও ব্যাপকক্ষতি হয়।